অমাবস্যার রাতে সেই পরিত্যক্ত জমিদার বাড়ি

 

বাংলা পেমের গল্প




গ্রামের শেষ মাথায় জঙ্গল ঘেরা প্রাচীন জমিদার বাড়িটি স্থানীয়দের কাছে এক আতঙ্কের নাম। “অদৃশ্য বাড়ি” নামে পরিচিত এই ইমারতটির সামনে দিয়ে যাওয়ার সময়ও মানুষ ফিসফিস করে কথা বলে। বিকেল গড়িয়ে একটু সন্ধ্যা নামলেই এ বাড়ির চারপাশের বাতাসে এক অদ্ভুত হিমশীতল নীরবতা নেমে আসে। শিয়াল বা ঝিঁঝি পোকার ডাকও যেন এ বাড়ির সীমানায় এসে হঠাৎ থমকে যায়। মানুষ বলে, এ বাড়ির প্রতিটা ইটের নিচে নাকি কোনো না কোনো পুরনো ইতিহাস বা অভিশাপ চাপা পড়ে আছে।

আমার নাম সোহাগ। ছোটবেলা থেকেই ভূতুড়ে বা রহস্যময় জায়গা নিয়ে আমার কৌতূহলের শেষ ছিল না। বড় হয়েও এই নেশাটা আমার কাটেনি। বহু বছর ধরে এই বাড়িটা নিয়ে এলাকার প্রবীণ মানুষদের মুখে নানা অলৌকিক গল্প শুনে আসছি। কেউ বলে সেখানে রাতের বেলা কান্নার আওয়াজ পাওয়া যায়, কেউ আবার বলে আলোর রোশনাই দেখা যায়। আজ আমি আর দূর থেকে গল্প শুনে সন্তুষ্ট থাকতে রাজি ছিলাম না। নিজে চাক্ষুষ প্রমাণ দেখতে সিদ্ধান্ত নিলাম, যেভাবেই হোক আজ রাতের অন্ধূকারে এই রহস্যের গভীরে প্রবেশ করবই।


সেদিন ছিল অমাবস্যার রাত। আকাশে মেঘের ঘনঘটা, চাঁদের আলো তো দূরের কথা, জোনাকির আলোও যেন আজ নিভে গেছে। পকেটে একটি পাওয়ারফুল টর্চলাইট, মোবাইল আর ছোট একটি নোটবুক নিয়ে আমি যখন সেই ভাঙা লোহার গেট দিয়ে ভেতরে পা রাখলাম, তখন সারা শরীর দিয়ে এক অদ্ভুত ভয়ের শিহরণ খেলে গেল। মনে হচ্ছিল শত বছরের পুরোনো ইটের দেয়ালগুলো আমার আগমন টের পেয়ে ফিসফিস করে নিজেদের মধ্যে কথা বলছে। বাড়ির মূল দরজায় কোনো তালা ছিল না, যেন কেউ জেনেশুনেই আমার জন্য দরজাটা খোলাই রেখেছিল। একটু ধাক্কা দিতেই ক্যাঁচ ক্যাঁচ শব্দে ভারী দরজাটি খুলে গেল। ভেতরে পা রাখতেই নাকে এল পুরোনো স্যাঁতসেঁতে কাঠের গন্ধ আর শতবর্ষী ধুলোর সুবাস।


টর্চের আলো ঘরের ভেতরে ফেলতেই দেখলাম মেঝেতে ধুলোর পুরু আস্তরণ জমে আছে। অথচ ঠিক মাঝখানের সিঁড়িটার ঠিক ওপরে টাঙানো বিশালাকার আয়নাটা একেবারে ঝকঝকে পরিষ্কার, যেন কেউ সবেমাত্র তাতে হাত বুলিয়ে মুছে দিয়ে গেছে। আমার বুকটা হুরমুড় করে কেঁপে উঠল। ঠিক সেই মুহূর্তে ওপরের তলা থেকে নূপুরের মৃদু ও ছন্দবদ্ধ ঝংকার শোনা গেল। এক, দুই, তিন… স্পষ্ট কোনো নারীর পায়ে পরা নূপুরের শব্দ। বুক কাঁপতে শুরু করল, তবুও কৌতূহল আর জেদ আমাকে পিছু হটতে দিল না। সাবধানে কাঠের তৈরি প্রাচীন সিঁড়ি বেয়ে ওপরে উঠতে লাগলাম। প্রতিটি পদক্ষেপে সিঁড়ির কাঠগুলো যন্ত্রণায় আর্তনাদ করে উঠছে।


দ্বিতীয় তলার লম্বা বারান্দার শেষ প্রান্তে পৌঁছানোর পর দেখলাম একটা রুমের দরজা আধখোলা। সেই রুমের ভেতর থেকে হলুদ রঙের আবছা আলো বারান্দায় এসে পড়েছে। আমি আস্তে করে হাত বাড়িয়ে দরজায় হালকা ধাক্কা দিলাম। ভেতরে তাকাতেই আমার রক্ত যেন এক মুহূর্তে বরফ হয়ে গেল। রুমের ঠিক মাঝখানে একটি প্রাচীন খোদাই করা কাঠের টেবিল, তার ওপর একটি টিমটিম করে হারিকেন জ্বলছে। টেবিলের সামনে পিঠ দিয়ে বসে আছেন এক নারী। পরনে তাঁর লাল পাড়ের মলমলে সাদা শাড়ি। তিনি খুব ধীরে ধীরে ঘাড় ঘুরিয়ে আমার দিকে তাকালেন। আলো-আঁধারিতে মুখটা সম্পূর্ণ স্পষ্ট না হলেও তাঁর চোখের গভীরে এমন এক অব্যক্ত বেদনা, ঘৃণা আর শূন্যতা দেখতে পেলাম, যা ভাষায় প্রকাশ করা অসম্ভব।


তিনি কোনো কথা বললেন না, ঠোঁট দুটো নড়ল না একটুও। শুধু তাঁর ডান হাত দিয়ে টেবিলের ওপর রাখা একটি লাল রঙের মখমলের ডায়রির দিকে ইশারা করলেন। আমি কাঁপতে কাঁপতে ঘরের ভেতরে পা রেখে এগিয়ে গিয়ে ডায়রিটা হাতে নিলাম। ভয়ে ভয়ে ডায়রির পাতা উল্টাতেই দেখলাম প্রথম দিককার পাতাগুলো পুরো ফাঁকা, শুধু একদম শেষ পাতায় কাঁচা হাতের কালিতে একটা লাইন লেখা রয়েছে: “যে ফিরে যাওয়ার জন্য এই অন্ধকার পৃথিবীতে আসেনি, তাকে জোর করে আর আটকে রেখো না…”


কথাটা পড়ার সাথে সাথেই ঘরের ভেতর এক তীব্র দমকা হাওয়া বইতে শুরু করল এবং সেই হাওয়ার ঝাপটায় টেবিলের হারিকেনটি নিভে গেল। চারপাশে নেমে এল ঘুটঘুটে অন্ধকার। আমি আর এক মুহূর্তও সেখানে দাঁড়াইনি। এক দৌড়ে সিঁড়ি বেয়ে নিচে নেমে সোজা বাড়ির বাইরে প্রধান গেট দিয়ে রাস্তায় এসে হাঁপাতে লাগলাম। পেছনে আর ফিরে তাকালাম না। মেঠো পথ ধরে কিছুটা দূরে এসে যখন পেছনে তাকিয়ে সেই দালানের দিকে তেকলাম, তখন শিউরে উঠলাম—দেখা গেল ওপরের তলার সেই জানালাটায় ঠিকই আবার হলুদ আলোটি দাউদাউ করে জ্বলে উঠেছে। সেই থেকে আজও ওই বাড়িটি আমার দুঃস্বপ্নে তাড়া করে বেড়ায়, আর আমি আজও বুঝতে পারিনি সেই লাল ডায়রির শেষ কথাটার মানে কী ছিল।


Comments

Popular posts from this blog

ছায়া ঘেরা শহরের এক চিল্লে রোদ

স্টেশন নম্বর ৪ এবং জলছবি

নিখোঁজ চিঠির রহস্য