নিখোঁজ চিঠির রহস্য
গ্রামের শেষ মাথায় পুরোনো একটা দোতলা বাড়ি। স্থানীয়রা বাড়িটাকে ভয় পায়, কারণ বিগত ত্রিশ বছর ধরে সেখানে কেউ থাকে না। অথচ মাঝেমধ্যে নাকি রাতের বেলা দোতলার বারান্দায় একটা টিমটিমে লণ্ঠনের আলো দেখা যায়।
আরিফ এবার ছুটিতে ঢাকা থেকে গ্রামে এসে এই বাড়িটার রহস্য ভেদ করার জেদ ধরল। এলাকার প্রবীণ চা-দোকানি লতিফ মিয়া তাকে সাবধান করে দিয়েছিলেন, “বাবা, ওই বাড়িতে যে-ই গেছে, সে আর আস্ত ফিরে আসেনি। ব্রিটিশ আমলের এক পোস্টমাস্টারের আত্মা নাকি আজও সেখানে চিঠির খোঁজ করে।”
কিন্তু আরিফ ভূতের ভয় পাওয়ার পাত্র নয়। সে আধুনিক যুগের তরুণ, বিজ্ঞান আর যুক্তিতে বিশ্বাসী। পরদিন ঠিক রাত আটটায় টর্চলাইট আর ক্যামেরা হাতে সে সেই পোড়ো বাড়ির সামনে গিয়ে হাজির হলো। বাড়ির মূল দরজাটা একটু ধাক্কাতেই ক্যাঁচক্যাচ শব্দ করে খুলে গেল। ভেতরে ঢুকেই নাকে এল স্যাঁতসেঁতে পুরোনো কাগজের গন্ধ।
অবিনাশ বাবুর ঘর
সিঁড়ি দিয়ে সাবধানে ওপরে উঠতে গিয়ে আরিফের পায়ে কী যেন একটা ধাক্কা খেল। নিচু হয়ে টর্চের আলো ফেলতেই সে চমকে উঠল। মেঝেতে ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে শত শত পুরোনো আমলের হলুদ হয়ে যাওয়া খাম আর চিঠি।
ঠিক তখনই দোতলার একটা ঘর থেকে ভেসে এল গোঙানির শব্দ—“আমার চিঠিগুলো… কেউ আমার চিঠিগুলো পৌঁছে দাও…”
আরিফের বুকটা কেঁপে উঠল। সে সাহস সঞ্চয় করে ধীরে ধীরে সেই ঘরের দরজায় গিয়ে উঁকি দিল। দেখল, জানালার পাশে কোণায় বসা এক বৃদ্ধ মানুষ, গায়ে পুরোনো দিনের আলখাল্লা, হাতে একটা থলে ভরা চিঠি।
আরিফ কাঁপাকাঁপা গলায় বলে উঠল, “কে… কে ওখানে?”
বৃদ্ধ মানুষটি ধীরেসুস্থে মুখ তুললেন। তাঁর চোখ দুটো শূন্য, কিন্তু কণ্ঠে অদ্ভুত এক আকুতি। তিনি বললেন, “আমি পোস্টমাস্টার অবিনাশ। এই চিঠিগুলো সময়মতো গন্তব্যে পৌঁছাতে পারিনি। যুদ্ধ লেগেছিল, সব ওলটপালট হয়ে গিয়েছিল। মানুষগুলো আজও তাদের প্রিয়জনের চিঠির অপেক্ষায় বসে আছে… আর আমি মুক্তি পাচ্ছি না।”
দায়িত্বের আর্তনাদ
আরিফের ভেতরের সাংবাদিক মনটা তখন ভয়কে ছাপিয়ে বড় হয়ে উঠেছে। সে এগিয়ে গিয়ে বৃদ্ধের হাত থেকে চিঠির থলেটা নিজের হাতে তুলে নিল। সে বুঝতে পারল, এটা কোনো ভূতের গল্প নয়, এটা যুগের পর যুগ জমে থাকা এক অবহেলিত দায়িত্বের আর্তনাদ।
আরিফ নরম গলায় বলল, “আপনি চিন্তা করবেন না অবিনাশ বাবু। আমি জীবিত থাকতে আপনার এই চিঠিগুলো ঠিকঠাক পৌঁছে দেব।”
কথাটা শেষ হতেই ঘরটাতে এক পশলা ঠান্ডা বাতাস বয়ে গেল। আর যখন আরিফ টর্চলাইট ফেলল, তখন দেখল ঘরের কোণটা একদম খালি—শুধু মেঝেতে পড়ে আছে সেই পুরোনো চিঠিগুলোর গোছা।
পরদিন সকালে গ্রামবাসীর চোখ কপালে উঠল, যখন তারা দেখল আরিফ গ্রামের প্রতিটি পুরোনো ঠিকানায় গিয়ে বিলিয়ে দিচ্ছে একাত্তর ও ব্রিটিশ আমলের সেই অমূল্য চিঠিগুলো। আর ওই পোড়ো বাড়িটার ওপর থেকে ভয় চিরতরে দূর হয়ে গেল।
Comments
Post a Comment