ছায়া ঘেরা শহরের এক চিল্লে রোদ
লেখক bs bhai
পর্ব ১: স্মৃতির ধুলোবালি
পুরোনো শহরটার একটা নিজস্ব গন্ধ আছে। ইট-কাঠের দেয়াল ভেদ করে বের হওয়া নোনা ধরা গন্ধ, কিংবা বিকেল নামলেই চায়ের দোকানের কেটলির চুঁইয়ে পড়া জলের আওয়াজ—সব মিলিয়ে একটা অদ্ভুত মায়াজাল। এই মায়াজালেই কেটে গেছে জীবনের চব্বিশটা বছর।
শহরের প্রাণকেন্দ্র থেকে একটু দূরে, কদম গাছের ছায়ায় ঘেরা একটা ছোট্ট দোতলা বাড়ি। নাম “নীড়”। বাড়ির বারান্দায় বসে তনয় যখনই নিচের রাস্তার দিকে তাকাত, তার মনে হতো সময় যেন এখানে এসে থমকে গেছে। তনয়ের বয়স এখন সাতাশ। চোখে চশমা, পরনে সামান্য একটা সুতির শার্ট আর গায়ে জড়িয়ে থাকা একরাশ উদাসীনতা। সে ফ্রিল্যান্সিং করে, ছোটখাটো ওয়েব কোডিংয়ের কাজ আর ব্লগে লেখালেখি—এই নিয়েই তার জগৎ। কিন্তু গত কয়েক মাস ধরে তার মন কোথাও যেন টিকছে না। সবকিছু কেমন যেন অচেনা ঠেকছে।
ঘরের টেবিলে রাখা ল্যাপটপের স্ক্রিনটা জ্বলজ্বল করছে। স্ক্রিনে ওপেন করা আছে একটা পুরোনো ব্লগপোস্ট, যেখানে গত কয়েক বছর ধরে সে তার জীবনের টুকরো টুকরো অনুভূতি লিখে আসছে। হঠাৎ করেই দরজায় কড়া নাড়ার শব্দ হলো।
“তনয় ভাইয়া আছেন নাকি ভেতরে?”—কণ্ঠস্বরটা পরিচিত। রিয়া। পাশের বাড়ির ছোট মেয়েটা, এখন বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ে। হাতে একটা খাম।
দরজা খুলতেই রিয়া মিষ্টি হেসে খামটা বাড়িয়ে দিল। “ভাইয়া, আম্মা পাঠাল। আপনাদের গাছের আমগুলোর আচার বানিয়েছে, তাই পাঠাল।”
তনয় খামটা নিয়ে মুচকি হাসল। “বলো কাকিাকে ধন্যবাদ। আর শোনো রিয়া, তুমি তো সেদিন বলছিলি একটা ভালো ওয়েবসাইট বা ব্লগ ডোমেইন সেটআপ নিয়ে কী যেন সমস্যা হচ্ছিল? ঠিক হয়েছে সেটা?”
রিয়া ল্যাপটপের টেবিলের দিকে তাকিয়ে এক পলক হাসল, “হ্যাঁ ভাইয়া, আপনার ওই কোডের স্নিপেটটা বসানোর পরই ঠিকমতো কাজ করছে। থ্যাংক ইউ সো মাচ!”
রিয়া চলে যাওয়ার পর তনয় আবার তার লেখার জগতে ফিরে গেল। কিন্তু আজ তার মন অন্য কোথাও পড়ে আছে। টেবিলে রাখা একটা পুরোনো ডায়রি। পাতার ভাঁজে ভাঁজে লুকিয়ে আছে এমন কিছু স্মৃতি, যা সে গত পাঁচ বছর ধরে কাউকে বলেনি। ডায়রির প্রথম পাতায় বড় বড় অক্ষরে লেখা— “সব হারিয়ে যাওয়ার পরও কিছু স্মৃতি খুব অদ্ভুতভাবে বেঁচে থাকে।”
পর্ব ২: ফেলে আসা দিনগুলোর খাতা
সেদিন বিকেলে তনয় ঠিক করল সে একটু শহরের অলিগলি ঘুরে আসবে। ঘরে বসে থাকতে থাকতে মাথার ভেতর কেমন যেন একটা দমবন্ধ ভাব তৈরি হচ্ছিল।
শহরের প্রধান মোড় পেরিয়ে সে গিয়ে বসল পুরোনো লাইব্রেরিটার সামনে। লাইব্রেরিটার বয়স তার চেয়েও বেশি হবে। কাঠের দরজা, কাঁচের আলমারিতে থরে থরে সাজানো জীর্ণ পৃষ্ঠার বই। সেখানে বসা বৃদ্ধ লাইব্রেরিয়ান মকবুল সাহেব চশমাটা নাকের ডগায় নামিয়ে তনয়ের দিকে তাকালেন।
“কী মিয়া সাহেব, আজকাল তো আর বইয়ের দিকে মাড়ান না দেখি! সারাক্ষণ ওই কম্পিউটার আর কোডিং নিয়ে পড়ে থাকেন?” মকবুল সাহেব একটু হেসে বললেন।
তনয় প্রতিবেশি সুলভ হাসিতে জবাব দিল, “আরে মকবুল চাচা, বই তো এখন স্ক্রিনেই চলে এসেছে। তবে আপনাদের এই কাগজের গন্ধের সাথে কোনোটারই তুলনা হয় না।”
মকবুল সাহেব একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। “কাগজের গন্ধ হলো মানুষের আসল অনুভূতির মতো—যত পুরোনো হয়, তার গভীরতা তত বাড়ে। আচ্ছা, ওই যে সুবর্ণা নামের মেয়েটা—মনে আছে? যে নিয়মিত আসত আপনাদের এলাকায়? সে গত পরশু একটা বই খুঁজতে এসেছিল। বলছিল সে নাকি এখন বাইরে থাকে, বহুদিন পর দেশে এসেছে।”
নামটা শোনার সাথে সাথেই তনয়ের বুকের ভেতরটা কেমন যেন মোচড় দিয়ে উঠল। সুবর্ণা। বিগত পাঁচ বছর ধরে যে নামটি সে নিজের মনের ভেতর খুব যত্নে লুকিয়ে রেখেছিল, আজ হঠাৎ এক অচেনা বাতাসে সেই নামটাই তার কানে এসে লাগল।
পাঁচ বছর আগের একটা বিকেল চোখের সামনে ভেসে উঠল। তখন তাদের দু’জনের মাঝে ছিল কেবল বই লেনদেন আর বিকেলের কফি কাপের উষ্ণতা। কিন্তু একটা ভুল বোঝাবুঝি, অথবা সময়ের নিষ্ঠুর স্রোত তাদের দু’জনকে দুই মেরুতে ঠেলে দিয়েছিল। সুবর্ণা চলে গিয়েছিল সুদূর প্রবাসে। তনয় আর কখনো যোগাযোগ করার চেষ্টা করেনি। নিজের ভেতরে এক অদ্ভুত অভিমান পুষে রেখে সে নিজেকে ডুবিয়ে দিয়েছিল কোডিং আর লেখার সাগরে।
পর্ব ৩: নিয়তির অদ্ভুত চাল
পরদিন সকালে তনয়ের ল্যাপটপের নোটিফিকেশন বেজে উঠল। একটা অজানা ইমেইল।
মেইলটা ওপেন করতেই তার চোখ কপালে উঠল। প্রেরকের নাম—সুবর্ণা চৌধুরী।
“তনয়, জানি না আমার এই মেইলটা তোমার কাছে পৌঁছাবে কি না। বহু বছর কেটে গেছে আমাদের শেষ কথা হওয়ার পর। আমি জানি তুমি এখন অনেক ব্যস্ত তোমার কোডিং আর ব্লগ নিয়ে। কিন্তু বিশ্বাস করো, গত কটি দিন এই শহরে এসে প্রতিমুহূর্তে মনে হয়েছে আমাদের ফেলে আসা পুরোনো গলিটার কথা। যদি সময় পাও, আগামীকাল বিকেলে সেই চেনা কদম গাছের মোড়ে একবার দেখা হতে পারে কি?”
তনয় কয়েক মুহূর্তের জন্য স্থবির হয়ে বসে রইল। হাত দুটি সামান্য কাঁপছে। ল্যাপটপের স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে তার মনে হলো, সময় যেন সত্যিই পেছনে হাঁটতে শুরু করেছে। সে কি যাবে? নাকি এড়িয়ে যাবে এই মুখোমুখি হওয়াকে?
সারাদিন নানা দ্বিধাদ্বন্দ্বে কাটল। রাতের বেলা সে তার পুরোনো ডায়রিটা আবার খুলে বসল। পাতার পর পাতা উল্টাতে উল্টাতে সে খেয়াল করল, সে আসলে এই মুহূর্তটির জন্যই এতদিন অপেক্ষা করছিল। সে যতবারই নিজেকে বোঝাতে চেয়েছে যে সে সুবর্ণাকে ভুলে গেছে, ততবারই তার মনের কোনো একটা কোণ থেকে প্রতিধ্বনি হয়েছে—না, সে ভোলেনি।
পর্ব ৪: কদম গাছের নিচে শেষ বিকেল
পরের দিন বিকেল নামতেই আকাশটা একটু মেঘলা হয়ে এল। ভ্যাপসা গরমের পর এক পশলা বৃষ্টির আভাস। তনয় গায়ে একটা হালকা জ্যাকেট জড়িয়ে বাড়ির বাইরে পা রাখল।
নির্ধারিত সেই কদম গাছের নিচে পৌঁছাতে তার বুকটা কেমন যেন ঢিপঢিপ করছিল। চারপাশের কোলাহল যেন হঠাৎ করেই থেমে গেছে। একটু দূরে দেখা গেল একটা চেনা অবয়ব। পরনে হালকা নীল রঙের সালোয়ার কামিজ, হাতে একটা ছোট চামড়ার ব্যাগ। সুবর্ণা দাঁড়িয়ে আছে।
তনয় ধীর পায়ে এগিয়ে গেল। “সুবর্ণা?”
মেয়েটি চমকে ঘুরে দাঁড়াল। তার চোখেও ঠিক সেই একই রকম বিস্ময় আর বহুদিনের জমিয়ে রাখা অব্যক্ত কথা। দীর্ঘ পাঁচ বছর পর সামনা-সামনি দু’জন দাঁড়িয়ে। মুখের রেখায় বয়সের সামান্য ছাপ পড়েছে হয়তো, কিন্তু চোখের সেই গভীর মায়া একটুও কমেনি।
“ভেবেছিলাম হয়তো আসবেই না,” মৃদু হেসে বলল সুবর্ণা।
“আসতে তো হতোই,” তনয় সামান্য হাসার চেষ্টা করল। “হঠাৎ এত বছর পর মনে পড়ার কারণ কী?”
সুবর্ণা চারপাশের পুরোনো ভবনগুলোর দিকে তাকিয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেলল। “বিদেশে গিয়ে অনেক কিছু পেয়েছি তনয়—ক্যারিয়ার, অর্থ, ব্যস্ততা। কিন্তু নিজের শিকড়টাকে কখনো ভুলতে পারিনি। আর বিশেষ করে… তোমায় ভুলতে পারিনি। যখনই কোনো পুরোনো ডায়রি খুলতাম, তোমার লেখা সেই কথাগুলো কানে বাজত।”
কথার মাঝেই হঠাৎ আকাশে জমে থাকা মেঘগুলো আর আটকে থাকতে পারল না। ঝুমঝুম করে বৃষ্টি নেমে এল পুরোনো শহরটার ওপর। কদম গাছের পাতা বেয়ে গড়িয়ে পড়তে লাগল জলের ফোঁটা। দু’জনে দৌড়ে গিয়ে আশ্রয় নিল পাশের একটা পুরোনো দালানের বারান্দায়।
চারপাশের বৃষ্টির শব্দে তাদের দুজনের হৃদস্পন্দন যেন একসুরে বাঁধা পড়ে গেল। সুবর্ণা তনয়ের দিকে তাকিয়ে বলল, “বাকি জীবনটা কি আর একা একা কোডিং করে কাটিয়ে দেবে, নাকি এই পুরোনো গল্পটাকে একটা নতুন পরিণতি দেবে?”
তনয় কোনো উত্তর দিল না। সে শুধু মুচকি হেসে সুবর্ণার হাতটা নিজের হাতের মুঠোয় তুলে নিল। বৃষ্টির মিষ্টি গন্ধ আর বহুদিনের জমে থাকা কষ্ট ধুয়ে মুছে সাফ হয়ে গেল এক নিমিষেই।
শহরটা তখনো ভিজছিল, আর তাদের জীবনের নতুন পাতাটা কেবল লেখা শুরু হচ্ছিল।
(সমাপ্ত)

Comments
Post a Comment