Posts

স্টেশন নম্বর ৪ এবং জলছবি

Image
  শহরের এক কোণে, ব্যস্ত রাস্তার ভিড় এড়িয়ে দাঁড়িয়ে থাকা পুরোনো কাঠের বাড়িটার নাম ‘টাইম ট্রাভেলার্স সাউন্ড’। দোকান হলেও এটাকে মেকানিকের ঘর বলাই ভালো। ঘরের ভেতর ইতস্তত ছড়িয়ে থাকা পুরোনো রেডিও, এনালগ ক্যাসেট প্লেয়ার আর ধূলো জমে যাওয়া গ্রামোফোনের রেকর্ড। এই সবকিছুর মাঝে বসা ২৪ বছরের তরুণ আকাশ। তার কাজই হলো নষ্ট হয়ে যাওয়া পুরোনো শব্দ আর গানকে আবার বাঁচিয়ে তোলা।​একদিন বর্ষার পড়ন্ত বিকেলে হঠাৎ দোকানে ঢুকল মৃত্তিকা। পরনে সাধারণ সুতির শাড়ি, হাতে একটা ভিজে যাওয়া চামড়ার ব্যাগ। মৃত্তিকা একজন আর্কিটেক্ট, যে পুরনো ঐতিহাসিক স্থাপনাগুলো নতুন করে নকশা করার কাজ করে। কিন্তু সেদিন সে কোনো স্থাপত্যের নকশা নিয়ে আসেনি; এনেছিল একটা ভাঙা কয়েলের এনালগ টেপ ক্যাসেট। সে মৃদু গলায় বলেছিল, “সবাই বলছে এই ক্যাসেট থেকে আর সুর উদ্ধার করা সম্ভব না। আপনি কি চেষ্টা করে দেখবেন?” আকাশ ক্যাসেটটি হাতে নিল। ক্যাসেটের গায়ে কোনো লেবেল নেই, শুধু এক কোণে হালকা পেন্সিলে লেখা ছিল—’স্টেশন ৪’।​পরের সাতদিন আকাশ রাত জেগে কেবল সেই ক্যাসেটের জট ছাড়ানোর চেষ্টা করল। ক্যাসেটের ফিতাগুলো এতটাই পাতলা হয়ে গিয়েছিল যে সামান্য ভুলে সব চিরতরে মু...

ছায়াশরীরের প্রেম | লেখক Bs Bhai (ইউনিক বাংলা প্রেমের গল্প)

  লেখক: Bs bha শহরের কোণে ছোট পুরোনো রেস্তোরাঁটার নাম ‘ক্যাফে মেমোরিজ’। কাচের জানালার বাইরে একটানা গুঁড়ি গুঁড়ি বৃষ্টি। ভেতরে ধোঁয়া ওঠা কফির কাপ হাতে একা বসে আছে আবির। আবিরের পেশা অদ্ভুত—সে মানুষের ফেলে যাওয়া পুরোনো চিঠি, ডায়েরি আর ছবি দিয়ে অনলাইন আর্কাইভ তৈরি করে। অতীত ঘেঁটে ইতিহাস খোঁজাটাই তার কাজ।​ঠিক দুপুর তিনটে বাজে। দরজার বেলটা বেজে উঠতেই ভেতরে ঢুকল অনুরাধা। পরনে সাধারণ নীল সুতির শাড়ি, ভেজা ছাতাটা দরজার এক পাশে রেখে সে আবিরের উল্টো পাশের চেয়ারটায় গিয়ে বসল। অনুরাধা একজন ফাইন আর্টসের ছাত্রী, যে পুরোনো বিলুপ্ত হওয়া চিত্রশিল্প নিয়ে গবেষণা করছে।​আবিরের দিকে একটি কাঠের পুরোনো বাক্স এগিয়ে দিয়ে অনুরাধা বলল, “সবাই বলল এই বাক্সটার মধ্যে কিছু ১৮০০ শতকের স্কেচ আছে, কিন্তু লকটা এতই পুরোনো যে কেউ খুলতে পারছে না। আপনি কি একটু চেষ্টা করবেন?”​আবির সাবধানে তার মেটাল টুলেইট দিয়ে বাক্সের পিতলের লকটা খোলার চেষ্টা করতে লাগল। প্রায় আধা ঘণ্টার চেষ্টায় একটা সূক্ষ্ম ‘ক্লিক’ শব্দে বাক্সটা খুলে গেল। ভেতরে কোনো মূল্যবান স্কেচ ছিল না; ছিল একটি চারকোল স্কেচে আঁকা তরুণীর পোর্ট্রেট আর পেছনে নীল কালিতে লেখা এক...

যে প্রেমে মুখ আঁকা বারণ

Image
লেখক Bs bhai বর্ষার রাত। চট্টগ্রাম শহরের প্রবর্তক মোড়ের এক পুরোনো ক্যাফেতে বসে বসে কফির কাপে চুমুক দিচ্ছিল নীল। বাইরে মুষলধারে বৃষ্টি, চশমার কাচ ঝাপসা হয়ে আসছে বারবার। ঠিক তখনই ক্যাফের ভারী কাঠের দরজাটা শব্দ করে খুলে যায়। ভেতরে ঢোকে এক তরুণী, হাতে একটা বৃষ্টিতে ভেজা ক্যানভাস আর রঙ-তুলির ব্যাগ।​মেয়েটি দরজার একপাশে দাঁড়িয়ে তার ভিজতে থাকা চুলগুলো ঝাঁকিয়ে নিল। তারপর চোখ বোলালো ক্যাফের ভেতরের প্রতিটি টেবিলের দিকে। নীল নিঃশব্দে পুরো দৃশ্যটা পর্যবেক্ষণ করছিল। মেয়েটির চোখেমুখে এক ধরনের অদ্ভুত নির্লিপ্ততা আর গভীর তৃষ্ণা লুকিয়ে ছিল—যেন সে কোনো হারানো সময় খুঁজে ফিরছে।​মেয়েটির নাম ইশরা। সে চারুকলার শেষ বর্ষের ছাত্রী। ইশরার একটা অদ্ভুত স্বভাব ছিল—সে কখনো মানুষের মুখ আঁকে না। তার প্রতিটি ক্যানভাসজুড়ে থাকে শুধুই অস্পষ্ট ছায়া, বৃষ্টির ফোঁটা, রোদের আলো-ছায়ার খেলা কিংবা শহরের নীরব কোনো গলি। মানুষের অবয়ব আঁকা শেষ হওয়ার আগেই সে ক্যানভাস গুটিয়ে নিত।​নীল পেশায় ফ্রিল্যান্স বইয়ের প্রচ্ছদ ডিজাইনার। তার অধিকাংশ কাজ কেটে যায় স্ক্রিন আর স্কেচবোর্ডের সামনে। নীরব মানুষের মনের ভেতরটা পড়া তার দীর্ঘদিনের স্বভাব। সেদিন...

বৃষ্টিভেজা অপেক্ষার শেষে – একটি সত্যি ভালোবাসার গল্প

Image
  চোখে এক অসীম অপেক্ষার ছায়া। ছবিটির নিচে ছোট করে নাম লেখা ছিল—‘আমার নীরব ভালোবাসা’। ছবিটি শুধু দেখার মতোই ছিল না, সেদিন সেই প্রদর্শনীতে নীলের ওই ছবিটিই প্রথম পুরস্কার জিতে নেয়। গ্যালারিতে উপস্থিত বিখ্যাত শিল্প সমালোচক ও উদ্যোক্তারা নীলের আঁকা ছবির প্রশংসা তো করলেনই, সাথে সাথে আন্তর্জাতিক একটি ফাউন্ডেশন থেকে নীলকে বিশাল এক বৃত্তির প্রস্তাব দেওয়া হলো। দর্শকদের তালি আর ক্যামেরার আলোর ঝলকানির মাঝে নীল খুঁজে নিচ্ছিল শুধু একটি মুখ। কোণায় দাঁড়িয়ে থাকা রিদির চোখে তখন আনন্দের জল। নীল ভিড় ঠেলে সোজা রিদির সামনে এসে দাঁড়াল। পকেট থেকে একটি ছোট ডায়েরি বের করে তার হাতে দিয়ে বলল, “এই ক্যানভাস আর এই ডায়েরির প্রতিটা পাতা শুধু তোমার অনুপ্রেরণায় তৈরি। আমি আর ব্যর্থ নই, রিদি।” সেই ডায়েরির প্রথম পাতায় লেখা ছিল তাদের পরিচয়ের প্রথম দিনের সেই ছোট কবিতাটি। কয়েক মাস পর, রিদির বাবা স্বয়ং নীলের বাসায় গিয়ে বিয়ের তারিখ ঠিক করে আসেন। সময়ের ঝোড়ো হাওয়ায় অনেক বাধা এসেছে ঠিকই, কিন্তু তাদের পারস্পরিক বিশ্বাস, ধৈর্য আর ভালোবাসা দিনশেষে জিতে গিয়েছিল। আজ এত বছর পরও বর্ষার রাতে যখন রিদি বারান্দায়...

অদৃশ্য ছায়া ও কুয়াশাচ্ছন্ন রাত

Image
 কুয়াশায় ঢাকা রাতটি যেন স্বাভাবিক আবহাওয়ার কোনো নিয়ম মানছিল না। রতনপুর গ্রামে কার্তিক মাসের শেষভাগে এমন ঘন কুয়াশা অতীতে কেউ দেখেনি। লালচে মেঠো পথটি গ্রামের শেষপ্রান্তের পুরানো জমিদার বাড়ির দিকে চলে গেছে। সেই পথ ধরে হাঁটছিল অয়ন। হাতে থাকা টর্চলাইটের হলুদ আলো কুয়াশার পুরু আস্তরণ ভেদ করতে পারছিল না। চতুর্দিকের নিস্তব্ধতা ভেঙে মাঝে মাঝে কোনো অচেনা পাখির ডানার শব্দ শোনা যাচ্ছিল, যা রাতের পরিবেশকে আরও রহস্যময় করে তুলছিল। অয়ন পেশায় একজন সাংবাদিক ও স্বাধীন গবেষক। লোককথা আর প্রত্নতাত্ত্বিক রহস্য উন্মোচন করা তার পুরোনো অভ্যাস। রতনপুরের জমিদার বাড়ি নিয়ে কয়েক দশক ধরে নানারকম অলৌকিক খবর ভেসে বেড়াচ্ছিল। স্থানীয়দের দাবি, অমাবস্যার রাতে ওই পুরানো অট্টালিকা থেকে সুরের ধ্বনি ভেসে আসে, আর মাঝে মাঝে নাকি প্রাসাদের উঁচু বেলকনিতে এক অজানা ছায়ামূর্তি পায়চারি করে। অয়ন এই ধরনের কুসংস্কার কখনো বিশ্বাস করেনি। ঘটনাটির আসল সত্য উদঘাটন করতেই তার এই রাতে সেখানে আগমন। জমিদার বাড়ির সামনে পৌঁছাতে অয়নের রাত সাড়ে এগারোটা বেজে গেল। এক সময়ের বিশাল প্রাসাদের সিংহদ্বারটি এখন ভগ্নপ্রায়। লোহার বিশাল গেটে পুরু জং ধরেছে, আর ...

অদৃশ্য রহস্যের খোঁজে: একটি পুরোনো সিন্দুক ও ডায়েরির গল্প

Image
  রাতের নিস্তব্ধতা যখন পুরো গ্রামটাকে গ্রাস করে ফেলেছিল, ঠিক তখনই পুরোনো জমিদার বাড়ির শেষ প্রদেয় আলোটুকু নিভে গেল। গ্রামের শেষ মাথায় অবস্থিত এই বাড়িটিকে নিয়ে অলৌকিক নানা গল্প প্রচলিত আছে। কিন্তু আবির কখনো এসব গল্পে কান দেয়নি। একজন তরুণ লেখক হিসেবে তার আগ্রহ ছিল শুধুই মানুষের মনস্তত্ত্ব এবং পুরোনো ঐতিহাসিক স্মারক নিয়ে। কিন্তু সে জানতো না, আজকের রাতটি তার জীবনের স্বাভাবিক গতিপথ চিরতরে বদলে দিতে চলেছে। একটি অজানা চিঠি এবং পুরোনো ডায়েরির রহস্য বাড়ির ধুলো জমে থাকা লাইব্রেরি ঘরে বসে আবির একটি পুরোনো সেগুন কাঠের আলমারি পরিষ্কার করছিল। হঠাৎ একটি খামের ভেতর থেকে বের হয়ে এলো হলদে হয়ে যাওয়া কতগুলো কাগজ। কোনো তারিখ লেখা নেই, তবে স্পষ্ট স্পষ্ট অক্ষরে লিখা একটি ডায়েরির পাতা। সেখানে প্রথম বাক্যটিই ছিল: “যে ঘটনাটি আমি লুকাতে চেয়েছিলাম, তা হয়তো আজকের রাতের পর আর গোপন থাকবে না।” আবিরের কৌতূহল এক মুহূর্তে কয়েক গুণ বেড়ে গেল। সে চশমাটা চোখের ওপর ঠিক করে নিয়ে পড়তে শুরু করল। ডায়েরির পাতাগুলোতে লেখা ছিল ১৯৪৫ সালের এক ঝড়ের রাতের কথা। এক রহস্যময় নাবিক এই গ্রামে এসেছিলেন একটি ধাতব বাক্স...

অমাবস্যার রাতে সেই পরিত্যক্ত জমিদার বাড়ি

Image
  গ্রামের শেষ মাথায় জঙ্গল ঘেরা প্রাচীন জমিদার বাড়িটি স্থানীয়দের কাছে এক আতঙ্কের নাম। “অদৃশ্য বাড়ি” নামে পরিচিত এই ইমারতটির সামনে দিয়ে যাওয়ার সময়ও মানুষ ফিসফিস করে কথা বলে। বিকেল গড়িয়ে একটু সন্ধ্যা নামলেই এ বাড়ির চারপাশের বাতাসে এক অদ্ভুত হিমশীতল নীরবতা নেমে আসে। শিয়াল বা ঝিঁঝি পোকার ডাকও যেন এ বাড়ির সীমানায় এসে হঠাৎ থমকে যায়। মানুষ বলে, এ বাড়ির প্রতিটা ইটের নিচে নাকি কোনো না কোনো পুরনো ইতিহাস বা অভিশাপ চাপা পড়ে আছে। আমার নাম সোহাগ। ছোটবেলা থেকেই ভূতুড়ে বা রহস্যময় জায়গা নিয়ে আমার কৌতূহলের শেষ ছিল না। বড় হয়েও এই নেশাটা আমার কাটেনি। বহু বছর ধরে এই বাড়িটা নিয়ে এলাকার প্রবীণ মানুষদের মুখে নানা অলৌকিক গল্প শুনে আসছি। কেউ বলে সেখানে রাতের বেলা কান্নার আওয়াজ পাওয়া যায়, কেউ আবার বলে আলোর রোশনাই দেখা যায়। আজ আমি আর দূর থেকে গল্প শুনে সন্তুষ্ট থাকতে রাজি ছিলাম না। নিজে চাক্ষুষ প্রমাণ দেখতে সিদ্ধান্ত নিলাম, যেভাবেই হোক আজ রাতের অন্ধূকারে এই রহস্যের গভীরে প্রবেশ করবই। সেদিন ছিল অমাবস্যার রাত। আকাশে মেঘের ঘনঘটা, চাঁদের আলো তো দূরের কথা, জোনাকির আলোও যেন আজ নিভে গেছে। পকেটে একটি পাওয়ারফুল টর্চলাই...