যে প্রেমে মুখ আঁকা বারণ
লেখক Bs bhai
বর্ষার রাত। চট্টগ্রাম শহরের প্রবর্তক মোড়ের এক পুরোনো ক্যাফেতে বসে বসে কফির কাপে চুমুক দিচ্ছিল নীল। বাইরে মুষলধারে বৃষ্টি, চশমার কাচ ঝাপসা হয়ে আসছে বারবার। ঠিক তখনই ক্যাফের ভারী কাঠের দরজাটা শব্দ করে খুলে যায়। ভেতরে ঢোকে এক তরুণী, হাতে একটা বৃষ্টিতে ভেজা ক্যানভাস আর রঙ-তুলির ব্যাগ।মেয়েটি দরজার একপাশে দাঁড়িয়ে তার ভিজতে থাকা চুলগুলো ঝাঁকিয়ে নিল। তারপর চোখ বোলালো ক্যাফের ভেতরের প্রতিটি টেবিলের দিকে। নীল নিঃশব্দে পুরো দৃশ্যটা পর্যবেক্ষণ করছিল। মেয়েটির চোখেমুখে এক ধরনের অদ্ভুত নির্লিপ্ততা আর গভীর তৃষ্ণা লুকিয়ে ছিল—যেন সে কোনো হারানো সময় খুঁজে ফিরছে।মেয়েটির নাম ইশরা। সে চারুকলার শেষ বর্ষের ছাত্রী। ইশরার একটা অদ্ভুত স্বভাব ছিল—সে কখনো মানুষের মুখ আঁকে না। তার প্রতিটি ক্যানভাসজুড়ে থাকে শুধুই অস্পষ্ট ছায়া, বৃষ্টির ফোঁটা, রোদের আলো-ছায়ার খেলা কিংবা শহরের নীরব কোনো গলি। মানুষের অবয়ব আঁকা শেষ হওয়ার আগেই সে ক্যানভাস গুটিয়ে নিত।নীল পেশায় ফ্রিল্যান্স বইয়ের প্রচ্ছদ ডিজাইনার। তার অধিকাংশ কাজ কেটে যায় স্ক্রিন আর স্কেচবোর্ডের সামনে। নীরব মানুষের মনের ভেতরটা পড়া তার দীর্ঘদিনের স্বভাব। সেদিন ক্যাফের ভিড়ে ইশরাকে দেখে তার মনে হয়েছিল, মেয়েটা যেন ক্যানভাসে ছবি আঁকে না, বরং ক্যানভাসের আড়ালে নিজেকে লুকিয়ে রাখে।ভাগ্যের অদ্ভুত টানে পর পর কয়েকটা বর্ষার সন্ধ্যায় তাদের বারবার দেখা হয়ে গেল একই ক্যাফের একই কোণের টেবিলে। প্রথম কিছুদিন দুজনের মাঝে কোনো কথা হয়নি। শুধু এক কাপ কফি আর বাইরে ঝরতে থাকা বৃষ্টির ঝমঝম শব্দই ছিল তাদের নীরব সঙ্গী।একদিন আচমকা ক্যাফের বাইরে প্রচণ্ড বজ্রপাত হলো। সঙ্গে সঙ্গে নিভে গেল ক্যাফের সব আলো। শুধু মোমের মৃদু আলোয় জ্বলে উঠল চারপাশ। ইশরা তার ক্যানভাস গুটিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করতেই হাত থেকে একটা তুলি নিচে পড়ে গেল। নীল ঝুঁকে সেটা তুলে নিয়ে ইশরার দিকে বাড়িয়ে দিল।নীল বলল, “তোমার আঁকা ছবিগুলো অনেক সুন্দর। কিন্তু একটা জিনিস খুব অবাক করে—সব ক্যানভাসে ঘরবাড়ি, পথঘাট, বৃষ্টি সব থাকে, কিন্তু কোনো মানুষ থাকে না কেন?”ইশরা মোমের ম্লান আলোয় নীলের দিকে তাকাল। তার চোখের কোণে এক চিলতে হাসি ফুটল, কিন্তু সে হাসিতে আনন্দ ছিল না।ইশরা বলল, “মানুষের মুখ বড় বেশি পরিবর্তনশীল নীল। আলো-ছায়ার খেলায় আজ যাকে সবচেয়ে কাছের মনে হয়, কাল সে মানুষটাই সবচেয়ে অচেনা হয়ে যায়। মুখের রূপ বদলে যায়, প্রকাশ বদলে যায়, কিন্তু মানুষের কষ্ট কিংবা ভালোবাসার অনুভূতিগুলো কখনো বদলায় না। তাই আমি অনুভূতি আঁকি, মুখ আঁকি না।”কথাটা নীলের বুকের গভীরে গিয়ে বিঁধল। সে বুঝতে পারল, ইশরার অতীতে এমন কোনো ক্ষত লুকিয়ে আছে, যা তাকে মানুষ থেকে দূরে সরিয়ে নিয়েছে।সেই রাতের পর থেকে তাদের সম্পর্কের বরফ গলতে শুরু করল। বৃষ্টিভেজা সন্ধ্যাগুলোতে তাদের দীর্ঘ আড্ডা জমতে লাগল। নীল তাকে শোনাত বিভিন্ন বইয়ের পেছনের গল্প, আর ইশরা শোনাত রঙের অদ্ভুত সব মনস্তত্ত্ব। চট্টগ্রাম শহরের সিআরবি থেকে পতেঙ্গা সমুদ্রসৈকত—দুজনের নিঃশব্দ পদচারণা বাড়তে থাকল। কোনো ধরনের প্রকাশ বা প্রতিশ্রুতি ছাড়াই দুজনের মধ্যে একটা অদৃশ্য অনুভূতির দেয়াল গড়ে উঠছিল। কথা না বলেও মন বুঝে নেওয়ার এক মায়াবী ক্ষমতা তৈরি হয়েছিল তাদের মধ্যে।মাস কয়েক পর, এক হেমন্তের শেষ বিকেলে ক্যাফের সিটে বসে ইশরা খুব মন খারাপ করে কফির কাপ ঘুরাচ্ছিল। নীল টেবিলে বসতেই সে দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল, “আমার এক বছরের স্কলারশিপ নিশ্চিত হয়েছে নীল। আগামী মাসে আমাকে ইতালি চলে যেতে হবে।”নীল থমকে গেল। কিছুক্ষণের জন্য ক্যাফের সব শব্দ যেন বন্ধ হয়ে গেল। বুকের ভেতর একটা তীব্র মোচড় দিল, কিন্তু নীল তার চেহারা স্বাভাবিক রাখার চেষ্টা করল।নীল ইশরার চোখের দিকে তাকিয়ে একটা মৃদু হাসি দিল। বলল, “তোমার তো চিরকালই ইউরোপীয় আর্ট গ্যালারিগুলো নিজের চোখে দেখার স্বপ্ন ছিল। এটা তো খুব ভালো খবর ইশরা! তোমার স্বপ্নের জয় হোক।”ইশরা নীলের দিকে তাকিয়ে রইল দীর্ঘক্ষণ। হয়তো সে নীলের চোখ থেকে এমন কিছু শুনতে চেয়েছিল, যা তাকে আটকে রাখবে। কিন্তু নীল তাকে বাঁধনে বাঁধতে চায়নি। সে জানত, মুক্ত পাখিকে পিঞ্জরে আটকে রাখলে ভালোবাসা মরে যায়।ইতালি যাওয়ার আগের দিন সন্ধ্যায় ইশরা নীলকে শেষবারের মতো দেখতে এল। সে নীলকে কোনো উপহার দিল না, শুধু হাতটা ছুয়ে নিঃশব্দে হেঁটে চলে গেল। নীলও তাকে থামায়নি।এরপর পেরিয়ে গেল দীর্ঘ দুই বছর।ইতালি যাওয়ার পর প্রথম প্রথম ইশরার কিছু সংক্ষিপ্ত বার্তা পেত নীল। পরে সেটাও আস্তে আস্তে কমে গেল। নীলও তার চেনা ছন্দে ফিরে গেল—কাজের ব্যস্ততা, নতুন প্রচ্ছদ আঁকা, আর বর্ষার বিকেলে একলা ক্যাফেতে বসে কফি খাওয়া। কিন্তু ক্যাফের সেই কোণের টেবিলটা নীলের কাছে আর কেবল টেবিল ছিল না, তা ছিল একরাশ স্মৃতি আর গভীর অনুভূতির আধার।এক বর্ষার দিনে চট্টগ্রাম শহরে আবার মুষলধারে বৃষ্টি নামল। ঠিক দুই বছর আগের সেই দিনটির মতোই। নীল তার পড়ার ঘরে বসে কাজ করছিল। হঠাৎ দরজায় কড়া নাড়ল কুরিয়ার বয়।একটা বড় চৌকো পার্স এসেছে। পার্সের প্রেরকের নাম ও ঠিকানায় লেখা—ফ্লোরেন্স, ইতালি।নীল ধীরহাতে কুরিয়ারের প্যাকটি খুলল। পার্সের কাগজগুলো সরাতেই তার চোখের সামনে ভেসে উঠল একটি বাঁধাই করা বিশালাকার ক্যানভাস।ক্যানভাসে স্পষ্ট ফুটে উঠেছে চট্টগ্রাম শহরের সেই পুরোনো ক্যাফেটি। বাইরে ঝরছে বৃষ্টি, ক্যাফের ভেতরে মোমের আলোয় আলোকময় এক পরিবেশ। আর ক্যানভাসের একদম মাঝখানে আঁকা—একটি তরুণের ছবি। তরুণের অবয়ব আর অস্পষ্ট নয়। একদম স্পষ্ট নীলের চেনা চশমা, তার পরিচিত নীল শার্ট, আর চোখে সেই গভীর নীরবতা। ক্যানভাসের প্রতিটা তুলির আঁচড়ে জমে আছে এক সমুদ্র অপেক্ষা আর ভালোবাসা।ক্যানভাসের পেছনের ফ্রেমে একটা ছোট সাদা চিরকুট আটকানো ছিল। নীল হাত কাঁপানো অবস্থায় চিরকুটটা খুলল। তাতে ইশরার স্পষ্ট হাতের লেখায় লেখা:”নীল, আমি আজীবন ভেবেছিলাম অনুভূতি আঁকা খুব সহজ, আর মানুষের মুখ আঁকা পৃথিবীর সবচেয়ে কঠিন কাজ। কিন্তু ইতালির এই বরফশীতল নির্জন রাতে ক্যানভাসে তুলি ধরে বুঝলাম, আমি ভুল ছিলাম।আমি যতবারই অন্য কিছু আঁকতে গেছি—পাহাড়, নদী বা রোমের প্রাচীন গলি—আমার তুলির আঁচড় বারবার বদলে গিয়ে শুধুই তোমার চোখ আর তোমার মুখ ফুটিয়ে তুলেছে। আমি অনুভূতির ক্যানভাসে রঙ ছিটাতে গিয়ে ভুল করে তোমাকেই একে ফেলেছি।আমি বুঝেছি, তুমি কোনো সাধারণ মানুষ নও, তুমি আমার অনুভূতি। আর অনুভূতিকে তো ক্যানভাস থেকে মুছে ফেলা যায় না নীল…”চিরকুটটা পড়ে নীল জানালার পাশে গিয়ে দাঁড়াল। বাইরের বর্ষার বৃষ্টি যেন হঠাৎ শান্ত হয়ে এল। নীল ক্যানভাসটার ওপর হাত বোলাতে বোলাতে হাসল। সে জানল, ভালোবাসা সবসময় পাশাপাশি থাকার নাম নয়; কিছু প্রেম দূরত্বের সব সীমানা পেরিয়ে অনুভূতির ক্যানভাসে চিরকালের জন্য অমর হয়ে থাকে।
Comments
Post a Comment